
গাইবান্ধা উপজেলা প্রতিনিধি মোঃ আশরাফুল ইসলাম
চাকরির মেয়াদ অবৈধভাবে বাড়াতে তিনি পরিকল্পিতভাবে এসএসসি সনদপত্র, এনআইডি ও এমপিও শিটে ভিন্ন ভিন্ন জন্মতারিখ ব্যবহার করেছেন।
তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, তার বেতন-ভাতার এমপিও শিটে জন্মসাল ১৯৭৮, এসএসসি সনদে ১৯৭৩, আর স্থানীয়ভাবে যাচাই করা তথ্যে উঠে এসেছে প্রকৃতপক্ষে তার জন্ম ১৯৭২ সালে।অভিযোগ অনুযায়ী, মোঃ মাহমুদ মিয়া (ইনডেক্স নং- এন ৫৬৮৮০০৫৬) এমপিও শিটে নিজের জন্মতারিখ দেখিয়েছেন ৩০ জুলাই ১৯৭৮ সাল। অথচ তার এসএসসি সনদপত্র ও পুরোনো এনআইডি কার্ডে জন্মতারিখ উল্লেখ রয়েছে ৩০ জুলাই ১৯৭৩ সাল। তিনি প্রকৃতপক্ষে ১৯৭২ সালে জন্মগ্রহণ করেন।
এই জন্মসাল জালিয়াতির ফলেই তৈরি হয়েছে অবিশ্বাস্য ও হাস্যকর হিসাব। কারণ, তিনি ১৯৮৯ সালে এসএসসি পাশ করেছেন, অথচ এমপিও শিটে দেখানো জন্মসাল অনুযায়ী সে সময় তার বয়স দাঁড়ায় মাত্র ১১ বছর। শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে এমন ঘটনা শুধু বিরলই নয়, বরং অসম্ভব বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
১১ বছর বয়সে এসএসসি পাসের এই তথ্যে ফাঁসের পর থেকেই এলাকাজুড়ে তীব্র প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এমপিও শিটেই প্রথম ধরা পড়ে গরমিল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতরের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ছাড়ের জন্য ব্যবহৃত অনলাইন এমপিও শিটে জয়েনপুর আদর্শ নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহমুদ মিয়ার জন্মতারিখ দেখানো হয়েছে ৩০ জুলাই ১৯৭৮ সাল। এই তথ্য অনুযায়ী তিনি দীর্ঘদিন ধরে সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করে আসছিলেন।অন্যদিকে, এসএসসি সনদে ধরা পড়ে ভয়াবহ গলদ। তার ১৯৮৯ সালের এসএসসি সনদপত্রের কপি অনুযায়ী, মাহমুদ মিয়া সাদুল্লাপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সাধারণ বিজ্ঞান বিভাগে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। সেই সার্টিফিকেটে তার জন্মতারিখ স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে ৩০ জুলাই ১৯৭৩ সাল।
অর্থাৎ, সরকারি স্বীকৃত এসএসসি সনদে থাকা সত্ত্বেও তিনি এমপিও শিটে জন্মসাল ১৯৭৮ দেখিয়ে বছরের পর বছর সরকারি অর্থ উত্তোলন করেছেন, এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। একইসঙ্গে এনআইডিতে গোপন সংশোধনের মাধ্যমে বয়স কমানোর নতুন কৌশলও ফাঁস হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সুচতুরভাবে মাহমুদ মিয়া নিজের এনআইডি কার্ডের তথ্য গোপনে সংশোধন করেন। তিনি পুরোনো এনআইডি কার্ডের তথ্য গোপন করে ভুয়া ও সৃজিত কাগজপত্র দেখিয়ে নতুন সংশোধিত ভোটার আইডি কার্ড তৈরি করেন। নতুন আইডিতে আগের জন্মতারিখ পরিবর্তন করে ৩০ জুলাই ১৯৭৮ সাল দেখান তিনি।
এর আগে তার ভোটার তালিকায় জন্মসাল ছিল ১৯৭৩। নির্বাচন অফিসের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তার সূত্রে কিশামত শেরপুর গ্রামের ভোটার তালিকা অনুসন্ধানে জন্মসাল ১৯৭৩ সালের সত্যতা পাওয়া যায়। সেই তালিকায় তার সিরিয়াল নম্বর ছিল ১২৪, ভোটার নম্বরের শেষাংশ ১২০১, পেশা হিসেবে শিক্ষক উল্লেখ ছিল এবং জন্মতারিখ লেখা ছিল ৩০ জুলাই ১৯৭৩ সাল।
অথচ সর্বশেষ প্রকাশিত ভোটার তালিকায় নতুন ভোটার হিসেবে তার জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরের শেষ চার সংখ্যা ৯২৭২, যেখানে জন্মতারিখ দেখানো হয়েছে ৩০ জুলাই ১৯৭৮ সাল।
তবে দীর্ঘদিন এই জালিয়াতি ধরা না পড়লেও সম্প্রতি ইএফটি যাচাইয়ে ফাঁস হয়েছে মাহমুদের জালিয়াতি। এ কারণে সাত মাস ধরে তার বেতন-ভাতা বন্ধ রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ইএফটি পদ্ধতিতে বিশেষ যাচাইয়ের সময় এমপিও শিট, এসএসসি সনদ ও এনআইডি কার্ডে জন্মতারিখের ভয়াবহ গরমিল ধরা পড়ে। এর ফলেই গত সাত মাস ধরে মাহমুদ মিয়ার অনলাইন বেতন-ভাতা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে।
তবে জালিয়াতি ফাঁসে বেতন বন্ধ হওয়ার পর থেকেই মাহমুদ মিয়া বিভিন্ন মহলে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বয়স জালিয়াতির বিষয়টি আড়াল করতে তিনি নতুন করে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছেন বলেও জানা গেছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, জয়েনপুর আদর্শ নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়টি মূল স্থান থেকে সরিয়ে নিজের গ্রামের সড়কের পাশে ফাঁকা জমিতে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে টিনশেড ভবনের ওই বিদ্যালয়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী না থাকলেও, ৯ জন শিক্ষক-কর্মচারী এমপিওভুক্ত হয়ে নিয়মিত সরকারের লাখ লাখ টাকা বেতন উত্তোলন করছেন। মাহমুদের বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ে হাজিরা জালিয়াতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক মাহমুদ মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আতাউর রহমান বলেন, প্রধান শিক্ষকের বয়স জালিয়াতির বিষয়টি ইএফটি শাখায় ধরা পড়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
Post Views: 16