ঢাকাFriday , 23 October 2026
  1. অন্যান্য
  2. অর্থনীতি
  3. আইন বিচার
  4. আন্তর্জাতিক
  5. ক্যাম্পাস
  6. খেলাধুলা
  7. গণমাধ্যম
  8. জনপ্রিয় সংবাদ
  9. জাতীয়
  10. বিনোদন
  11. রাজধানী
  12. রাজনীতি
  13. সারাদেশ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ভৈরবে ইভটিজিংয়ের অভিযোগ ঘিরে সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি অভিযোগে মামলা ও সংবাদ সম্মেলন

Link Copied!

কক্সবাজারে থাকার দাবি শ্রমিকদল নেতা রুবেলের, তদন্ত কর্মকর্তা ও ওসির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন—দুই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি পরিবারের

কিশোরগঞ্জে জেলা প্রতিনিধিঃমোঃ সনজু মিয়া।

কিশোরগঞ্জের ভৈরব পৌর শহরের চন্ডীবের মধ্যপাড়ায় এক স্কুলছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ, মারামারি, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও মামলা নিয়ে এলাকায় আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। একটি পক্ষের অভিযোগ, ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে তাদের পরিবারের সদস্যরা হামলার শিকার হন। অন্যদিকে, ছিনতাই ও অর্থ লুটের মামলার আসামি শ্রমিকদল নেতা রুবেল দাবি করেছেন, ঘটনার সময় তিনি কক্সবাজারে ছিলেন। তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও দাবি করেন তিনি।

এ ঘটনায় অভিযোগ গ্রহণ, তদন্তের নিরপেক্ষতা এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে অভিযুক্ত পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের দাবি, দুটি অভিযোগেরই সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

স্কুলছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ

পরিবারের দেওয়া অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৮ অক্টোবর সকালে চন্ডীবের মধ্যপাড়া এলাকায় একটি কারখানার সামনে দিয়ে প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার সময় ১৪ বছর বয়সী এক স্কুলছাত্রীকে কয়েকজন কর্মচারী উত্ত্যক্ত করে বলে অভিযোগ করেন তার মা সালমা বেগম। তিনি অভিযোগে আরও উল্লেখ করেন, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানাতে গেলে তাঁকে অপমানজনক কথাবার্তা বলা হয় এবং তাঁর স্বামী প্রতিবাদ করতে গেলে তাঁকেও হুমকি দেওয়া হয়।

সালমা বেগমের অভিযোগে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দোষর ও ভূমি দোস্য নুরু মিয়া ও রানা মিয়াসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে স্কুলছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করা এবং প্রতিবাদকারীদের ভয়ভীতি দেখানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় তিনি ভৈরব থানায় লিখিত অভিযোগ দেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

তবে অভিযোগে উল্লিখিত ঘটনাগুলোর সত্যতা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের গৃহীত পদক্ষেপ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য ও তদন্তের ফল ছাড়া কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।

পরবর্তী সংঘর্ষ ও ছিনতাইয়ের মামলা

অন্য একটি অভিযোগপত্রে মাসুদুর রহমান রানা দাবি করেন, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে চন্ডীবের মধ্যপাড়ায় একটি মুড়ির মিলের পাশের সড়কে তাঁর ভাই নুরুল হকের ওপর কয়েকজন হামলা চালান। অভিযোগে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, দেশীয় অস্ত্র দিয়ে আঘাত এবং ১৬ লাখ টাকা ভর্তি একটি কালো ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ওই অভিযোগে মাসুম, রুবেল, মোহাম্মদ আলী, জীবন ও রাজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, হামলায় নুরুল হক গুরুতর আহত হন এবং প্রথমে ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়।

অভিযোগপত্রে দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারার উল্লেখ রয়েছে। তবে মামলার সুনির্দিষ্ট ধারা, এজাহারভুক্তির তারিখ, চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি এবং তদন্তের বর্তমান অবস্থা সংশ্লিষ্ট নথি থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

রুবেলের দাবি: ঘটনার সময় কক্সবাজারে ছিলেন

মামলার ২ নম্বর আসামি রুবেল দাবি করেন, ১৭ অক্টোবর রাতে ভৈরব পৌর শ্রমিকদলের সভাপতি মো. সিয়াম মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রউফের নেতৃত্বে শ্রমিকদলের ৯৭ জন নেতাকর্মীর সঙ্গে তিনি কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনে তাঁদের বিদায় জানান ভৈরব পৌর বিএনপির সভাপতি ও সাবেক মেয়র হাজী মোহাম্মদ শাহিন।

রুবেলের দাবি, ১৮ অক্টোবর দুপুর ২টার দিকে যখন হামলা ও টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে, তখন তিনি কক্সবাজারে ছিলেন। তাঁর বক্তব্য, ট্রেনযাত্রার ছবি, দলীয় গ্রুপ ছবি, হোটেলের রেকর্ড, খাবার গ্রহণ ও সমুদ্রসৈকতে ভ্রমণের ছবি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই করলে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্যও তদন্তের আওতায় নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

রুবেল আরও দাবি করেন, তাঁর প্রায় ৭০ বছর বয়সী বাবা মোহাম্মদ আলী সম্প্রতি হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন এবং শারীরিকভাবে দুর্বল। এ অবস্থায় তাঁর বাবার বিরুদ্ধেও হামলায় অংশ নেওয়ার অভিযোগকে রুবেল অসত্য বলে দাবি করেন। একই সঙ্গে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও ঘটনার সঙ্গে জড়িত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এসব বক্তব্যের সত্যতা নির্ধারণে ভ্রমণের নথি, ছবি, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের প্রাসঙ্গিক তথ্য, চিকিৎসার কাগজপত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি যাচাই করা প্রয়োজন।

তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ

রুবেল ও তাঁর পরিবারের অভিযোগ, স্কুলছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করার বিষয়ে সালমা বেগমের করা অভিযোগের তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে এসআই এম নাইমুল ইসলাম মোস্তাক দায়িত্ব পাওয়ার পর তাঁর মায়ের কাছ থেকে নগদ ২ হাজার টাকা নেন। অভিযোগকারীদের দাবি, মামলা দ্রুত এজাহারভুক্ত করার আশ্বাসে ওই অর্থ নেওয়া হয়েছিল।

তাঁদের আরও অভিযোগ, আগের অভিযোগটির যথাযথ অনুসন্ধান না করেই পরবর্তী সংঘর্ষের ঘটনায় দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁদের পরিবারের সদস্যদের আসামি করা হয়েছে। এ কারণে তাঁরা ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান এবং তদন্ত কর্মকর্তা এম নাইমুল ইসলাম মোস্তাকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

তবে ঘুষ গ্রহণ, তদন্তে গাফিলতি কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে ফাঁসানোর অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যও এখানে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তাই অভিযোগগুলো তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।

সংবাদ সম্মেলনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার পরদিন ১৯ অক্টোবর সালমা বেগম পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে স্কুলছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ তদন্ত, পরবর্তী সংঘর্ষের প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন এবং পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়।

রুবেল বলেন, “আমরা চাই, কারও প্রভাব বা পরিচয় বিবেচনা না করে প্রকৃত ঘটনা যাচাই করা হোক। যাঁর অপরাধ প্রমাণিত হবে, তাঁর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু নির্দোষ কেউ যেন মিথ্যা অভিযোগে হয়রানির শিকার না হন।”

তাঁদের দাবি, দুই পক্ষের অভিযোগ, চিকিৎসার নথি, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং ঘটনার সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবস্থান যাচাই করে তদন্তের ফল প্রকাশ করা হোক। পাশাপাশি তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত ঘুষ গ্রহণের অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করা হোক।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত

একটি স্কুলছাত্রীর নিরাপত্তার প্রশ্ন যেমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ উঠলেই তাঁকে অপরাধী হিসেবে ধরে নেওয়াও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে; আর অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে নির্দোষ ব্যক্তিদের সুরক্ষা ও প্রতিকারের পথ নিশ্চিত করতে হবে।

এ ঘটনায় পুলিশের দায়িত্ব হলো—দুই পক্ষের বক্তব্য শোনা, অভিযোগের সময়ক্রম যাচাই, চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি পরীক্ষা, নির্ভরযোগ্য আলামত সংগ্রহ এবং আইন অনুযায়ী তদন্ত সম্পন্ন করা। তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ থাকলে সেটিও যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

ন্যায়বিচার কারও ব্যক্তিগত বিজয় নয়; এটি রাষ্ট্র ও আইনের প্রতি মানুষের আস্থার ভিত্তি। একটি অভিযোগ যেন আরেকটি অভিযোগকে আড়াল না করে, আবার কোনো প্রভাবশালী পক্ষের বক্তব্যও যেন তদন্তের বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়। সত্য উদ্‌ঘাটন, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনের সমান প্রয়োগই পারে এই বিরোধের গ্রহণযোগ্য সমাধান নিশ্চিত করতে।

প্রতিবেদকের বক্তব্য: এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা, মামলার বাদী এবং অন্য অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে। মামলার এজাহার, চিকিৎসার নথি, কক্সবাজারে অবস্থানের প্রমাণ এবং তদন্তের অগ্রগতি যাচাইয়ের মাধ্যমে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা প্রয়োজন।