
উসমান গনি, শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি
মানুষের জীবন মানেই রোদ-ছায়ার খেলা। কখনো তপ্ত রোদে পুড়ে হাড়ভাঙা খাটুনি, আবার কখনো প্রাপ্তির শীতল বৃষ্টিতে ধুয়ে যাওয়া সব ক্লান্তি। গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভার লোহাগাছ গ্রামের দক্ষিণ পাড়ার বাসিন্দা, দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার শ্রীপুর প্রতিনিধি ইকবাল হোসেনের জীবনের গল্পটা ঠিক এমনই। দুই দশকের দীর্ঘ লড়াই, আত্মত্যাগ আর ধৈর্যের পর আজ তিনি জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহারের দেখা পেয়েছেন। তিনি এখন একজন গর্বিত ও পরম সুখী ‘নানা’।
শূন্য হাতে সংগ্রামের শুরু
২০০০ সালে জীবিকার তাগিদে গ্রাম ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন রাজধানী ঢাকায়। শুরু হয়েছিল এক অনিশ্চিত জীবনযুদ্ধ। ভাড়া করা ছোট্ট ঘরে থেকে তিল তিল করে স্বপ্ন সাজানো। এর মধ্যেই ২০০৫ সালে শুরু হয় দাম্পত্য জীবন। তবে দায়িত্বের পরিধি ছিল বিশাল। নিজের সংসারের পাশাপাশি অসহায় শাশুড়ির দায়িত্বও কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তিনি হাসিমুখে। শ্বশুরবাড়ির দুর্দিনে পরম মমতায় আগলে রেখেছিলেন স্বজনদের।
সন্তানের ভবিষ্যৎই ছিল ধ্যান-জ্ঞান
২০০৭ সালের ৭ জানুয়ারি প্রথম কন্যাসন্তানের আগমনে জীবনে প্রথম পূর্ণতার স্বাদ পান তিনি। এর দুই বছর পর জন্ম নেয় দ্বিতীয় কন্যা। দুই মেয়ের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য তিনি নিজের সব শখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়েছেন। ২০১২ সালে মেয়েদের পড়াশোনার কথা ভেবে ঢাকা ছেড়ে আবার থিতু হন শ্রীপুরে। ভর্তি করান শ্রীপুর সরকারি মডেল স্কুলে। অভাবের ছায়া যাতে সন্তানদের স্পর্শ না করে, সেজন্য দিনের পর দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছেন এই লড়াকু পিতা।
২০১৮ সালে বাবাকে হারানোর শোক আজও তাকে ব্যথিত করে। তবে জীবনের অমোঘ নিয়মে শোককে শক্তিতে রূপান্তর করেছেন। ২০২৪ সালে বড় মেয়ে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পর তাকে সুপাত্রে দান করেন। একজন বাবার কাছে মেয়ের বিদায়বেলা যতটা আবেগের, দায়িত্ব পালনের তৃপ্তি ছিল তার চেয়েও বেশি শান্তির।
> “আমি হয়তো জীবনে অনেক বড় কিছু করতে পারিনি, কিন্তু একজন বাবা হিসেবে আমার দায়িত্ব পালন করার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি। যখন নিজের সন্তানের মুখে হাসি দেখেছি, তখন মনে হয়েছে আমার সব কষ্ট সার্থক।”
সব মেঘ কেটে গিয়ে আজ তার আকাশে ধরা দিয়েছে পূর্ণিমার চাঁদ। বড় মেয়ের কোল আলো করে এসেছে নতুন অতিথি। আজ তিনি নানা হয়েছেন। সেই ছোট্ট নাতনির নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকালে যেন গত দুই দশকের সব ক্লান্তি এক নিমেষে উধাও হয়ে যায়।
তিনি আলহামদুলিল্লাহ বলে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সাংবাদিক ইকবাল হোসেন বলেন—
“জীবনের সব কষ্টই একদিন আনন্দের গল্প হয়ে যায়। আজ নাতনির হাসিতে আমি আমার জীবনের সমস্ত কষ্টের সার্থক মূল্য খুঁজে পেয়েছি। আমি আজ সত্যিই একজন সুখী নানা।”
কঠিন সংগ্রামের পথ পেরিয়ে আজকের এই প্রাপ্তি প্রমাণ করে—ধৈর্য, দায়িত্ববোধ আর ভালোবাসা থাকলে দিনশেষে সুখের দেখা পাওয়া সম্ভব। লোহাগাছ গ্রামের সেই লড়াকু যুবক আজ একজন সফল পিতা এবং একজন পূর্ণ তৃপ্ত নানা হিসেবে সমাজের কাছে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
Post Views: 18