আগামী ৭ নভেম্বর দেশে সাধারণ ছুটি পালিত হবে। দিনটি ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে ঘটে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহের স্মরণে দিনটি পালন করা হয়। দীর্ঘদিন পর দিবসটিকে আবারও সরকারি ছুটির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করায় এর ইতিহাস, তাৎপর্য এবং ছুটি ঘোষণার কারণ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
২০২৬ সালের ৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রতিবছর ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পালনের এবং এ উপলক্ষে সাধারণ ছুটি ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এর ফলে ২০২৬ সাল থেকে প্রতিবছর ৭ নভেম্বর সরকারি সাধারণ ছুটি থাকবে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দিনটি শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে পালন নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ বুঝতে হলে ওই বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে ফিরে তাকাতে হয়। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব নিয়ে একের পর এক পরিবর্তন ঘটতে থাকে। একই বছরের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
সে সময় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরেও নেতৃত্ব ও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। ৩ নভেম্বর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। কয়েক দিনের মধ্যে সেনাবাহিনীর ভেতরে পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে। ৭ নভেম্বর সেনাসদস্যদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের কথাও ঐতিহাসিক বিবরণে উঠে এসেছে। ওই ঘটনার পর জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত হন এবং দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতার সমীকরণে বড় পরিবর্তন আসে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই পরবর্তী সময়ে ৭ নভেম্বর ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পরিচিতি পায়। তবে দিনটির ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্নমত রয়েছে। বিএনপি দিনটিকে সিপাহি-জনতার বিপ্লব ও সংহতির প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করে। জাসদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের কাছে এটি সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ দিনটির ঘটনাপ্রবাহকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে এবং এর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ যুক্ত করে। ফলে ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর মূল্যায়ন দল ও রাজনৈতিক অবস্থানভেদে আলাদা।
সরকারের পক্ষ থেকে দিনটিকে জাতীয় দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্তের পর এবার দেশব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপ সাজানো এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে দিবসটি উপলক্ষে বাণী দেওয়ার কর্মসূচিও রয়েছে। দেশের মসজিদগুলোতে বিশেষ মোনাজাত এবং অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হবে।
এ ছাড়া হাসপাতাল, কারাগার, এতিমখানা ও বিভিন্ন সেবাপ্রতিষ্ঠানে উন্নতমানের খাবার পরিবেশনের কর্মসূচি রাখা হয়েছে। শিশুদের জন্য দেশের বিভিন্ন শিশু পার্ক বিনা টিকিটে উন্মুক্ত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আলোচনা সভা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ আয়োজন, রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এবারের ছুটি নিয়ে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের ৭ নভেম্বর শনিবার। বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটি শুক্র ও শনিবার হওয়ায় এ বছর সাধারণ ছুটির কারণে অতিরিক্ত কোনো কর্মদিবস ছুটি পাওয়া যাচ্ছে না। তবে দিনটি সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাধারণ ছুটি হিসেবেই পালিত হবে।
সব মিলিয়ে, ৭ নভেম্বরের গুরুত্ব কেবল সরকারি ছুটির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক ও সামরিক ঘটনাপ্রবাহ, সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের সঙ্গে দিনটি গভীরভাবে জড়িত। সরকার দিনটিকে আবারও জাতীয় পর্যায়ে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বাংলাদেশের ইতিহাসের এই অধ্যায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের অবস্থান ও ইতিহাসের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রাখা জরুরি।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃসনজু মিয়া। উপদেষ্টাঃ- মোঃসিয়াম মিয়া। নির্বাহী সম্পাদক মোঃ জসিম মিয়া, বার্তা সম্পাদক মোঃরনজু মিয়া। ঢাকা অফিস : আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০। যোগাযোগের ঠিকানা:-কিশোরগঞ্জ সদর । বার্তা কার্যালয়ঃ-ভৈরব কিশোরগঞ্জ। মোবাইল: ০১৫৬৮৩৪৬৫৯৫ ( সম্পাদক),
All rights reserved © 2025