বয়স যে শিক্ষার পথে বাধা হতে পারে না, তা প্রমাণ করেছেন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. আমিনুল ইসলাম। ৪৭ বছর বয়সে এইচএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ৪ দশমিক ৬৩ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। এসএসসি পাসের ২৭ বছর পর আবারও পড়াশোনায় ফিরে তাঁর এই সাফল্য এলাকায় প্রশংসা কুড়াচ্ছে। একই সঙ্গে পড়াশোনা মাঝপথে ছেড়ে দেওয়া কিংবা বয়সের কারণে নতুন করে শিক্ষাজীবন শুরু করতে দ্বিধায় থাকা মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন তিনি।
আমিনুল ইসলাম শ্রীপুর উপজেলার মাওনা ইউনিয়নের চকপাড়া গ্রামের তুরাব আলীর ছেলে। ১৯৯৯ সালে মাওনা বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন তিনি। এরপর পারিবারিক দায়িত্ব ও জীবিকার তাগিদে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। সময়ের সঙ্গে সংসার ও কাজের ব্যস্ততা বাড়লেও উচ্চশিক্ষা অর্জনের ইচ্ছা হারিয়ে যায়নি তাঁর। দীর্ঘদিনের সেই স্বপ্ন পূরণের সুযোগ খুঁজছিলেন তিনি।
জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজেকে আরও শিক্ষিত করে গড়ে তোলার তাগিদ থেকেই আবার পড়াশোনা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন আমিনুল। সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ২০২৪ শিক্ষাবর্ষে গাজীপুর মহানগরীর পুবাইল এলাকার সিটি ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। এরপর সংসার, ব্যক্তিগত কাজ এবং ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্ব সামলে শুরু করেন নতুন করে শিক্ষাজীবনের পথচলা।
দীর্ঘ ২৭ বছরের বিরতির পর বই-খাতা হাতে নেওয়া সহজ ছিল না। বয়সের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দায়িত্ব ও ব্যস্ততা। দিনের কাজ শেষে অবসর সময়ে পড়াশোনার জন্য সময় বের করতেন তিনি। নিয়মিত অধ্যবসায় ও প্রবল ইচ্ছাশক্তির ওপর ভর করেই এগিয়ে যান পরীক্ষার প্রস্তুতিতে। অবশেষে ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে জিপিএ ৪ দশমিক ৬৩ অর্জনের মধ্য দিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হয়।
নিজের এই সাফল্য নিয়ে মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার কোনো বয়স নেই, প্রয়োজন শুধু ইচ্ছাশক্তির। বিভিন্ন কারণে যাঁরা মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছেন, তাঁর এই অর্জন দেখে তাঁরা নতুন করে পড়াশোনা শুরু করার সাহস পাবেন বলে আশা করেন তিনি। সংসার ও দায়িত্ব সামলেও যে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব, সেটিই প্রমাণ করতে চেয়েছেন বলে জানান এই জনপ্রতিনিধি।
এইচএসসি পাসের পরও থেমে থাকতে চান না আমিনুল ইসলাম। সুযোগ হলে আগামীতে অনার্সে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জনের ইচ্ছা রয়েছে তাঁর। দীর্ঘ বিরতির পর আবার শিক্ষাজীবনে ফিরে ভালো ফলাফল অর্জন করায় নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
আমিনুল ইসলামের এই অর্জনকে প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করেছেন শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদ ভূঁঞা। তিনি বলেন, ৪৭ বছর বয়সে পড়াশোনা করে এইচএসসি পাস করা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় কাজ। এই বয়সে এসে পড়াশোনা করে ভালো ফলাফল অর্জন বর্তমান সমাজের জন্য একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।
শুধু একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া নয়, আমিনুল ইসলামের এই সাফল্য দেখিয়েছে—জীবনের ব্যস্ততা, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা দীর্ঘদিনের বিরতি কোনো কিছুই শিক্ষার পথে চূড়ান্ত বাধা নয়। নতুন করে শুরু করার সাহস আর অধ্যবসায় থাকলে যেকোনো বয়সেই স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

