ইরানের জব্দ করা ৬০০ কোটি ডলারের বেশি সম্পদ ছাড় এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চলছে। কাতারের মধ্যস্থতায় এ আলোচনা এগোলেও সমঝোতা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কায় উপসাগরীয় দেশগুলোও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের এক শীর্ষ কর্মকর্তা।
রোববার (১ নভেম্বর) কাতারের রাজধানী দোহায় দুই দেশের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা অব্যাহত থাকে। আলোচনার অন্যতম বিষয় ইরানের জব্দ করা ৬০০ কোটি ডলারের বেশি সম্পদ ছাড়। এর বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরুর পথ তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বলেন, নতুন করে উত্তেজনা বাড়ানো ইরান কিংবা তার প্রতিবেশী কোনো দেশের স্বার্থে নয়। তবে পরিস্থিতি খারাপের দিকে গেলে তার জন্যও প্রস্তুতি রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা আগেও যেমন দেখিয়েছি, এবারও সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রয়েছি।’
গারগাশ আরও বলেন, ইরান তাদের প্রতিবেশী এবং দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘস্থায়ী সংকটে ইরান জড়িয়ে পড়ুক, তা তাঁরা চান না।
এদিকে হরমুজ প্রণালির কাছে কাতারের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী (এলএনজি) জাহাজে অজ্ঞাতপরিচয় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার খবরও আলোচনায় নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। জাহাজটি পাকিস্তানের উদ্দেশে যাচ্ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে তেহরান জাহাজটিকে চলাচলের অনুমতি দিয়েছিল।
দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার সংকট কাটাতে কাতার একটি সমঝোতার চেষ্টা করছে। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও ইরানের জব্দ সম্পদ ছাড়ের বিষয়টির পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং পরমাণু আলোচনা শুরুর বিষয়ও রয়েছে। আলোচনার সময়সীমা সাত দিন থেকে কমিয়ে দুই দিনে আনার বিষয়ে ইরান সম্মত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত অন্য পথের পরিবর্তে কূটনীতিকে বেছে নেওয়া। ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে ইরান প্রতিরক্ষা ও কূটনীতি—দুই পথের জন্যই প্রস্তুত রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার তাৎক্ষণিক কোনো পরিকল্পনা নেই বলেও জানান তিনি।
দোহার মধ্যস্থতামূলক আলোচনায় সরাসরি অংশ নিচ্ছেন না আরাগচি। সোমবার তাঁর তুর্কমেনিস্তান যাওয়ার কথা রয়েছে। তবে ইরানের অন্য কূটনীতিকেরা আলোচনায় যুক্ত রয়েছেন।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতার বড় একটি অংশ ধ্বংস করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এক বা দুটি লক্ষ্যবস্তুতে এখনো ব্যবস্থা নেওয়া বাকি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। অন্যদিকে, হামলা হলে পাল্টা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা ভালোভাবে এগোচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। তবে ইরানকে খুব একটা নির্ভরযোগ্য মনে করেন না বলেও জানান তিনি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, কূটনৈতিক সমাধানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত রয়েছে।
ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি জানান, আলোচনা পুনরায় শুরুর বিষয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের কাছ থেকে একটি চিঠি পেয়েছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যের সুরে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করেছেন বলেও দাবি করেন রেজায়ি।
আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরাগচি বলেন, তেলবাহী জাহাজ চলাচলে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ তুলে নেওয়া, ইরানের জব্দ সম্পদ ছাড়ের পথে বাধা দূর করা এবং তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে দুই দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে তেহরান।
তবে ইরানের পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার আলী নিকজাদ জানিয়েছেন, পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বসতে রাজি নয় তেহরান। তাঁর দাবি, পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে অতীতের অভিজ্ঞতা এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার কারণে এ বিষয়ে আলোচনার প্রতি ইরানের অনীহা রয়েছে।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালি চালু, জব্দ সম্পদ ছাড় এবং পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কায় উপসাগরীয় দেশগুলো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান,

