
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধিঃ- মোঃসনজু মিয়া
কিশোরগঞ্জের ভৈরবে মেঘনা নদীর ভাঙন ঠেকাতে চলমান বেড়িবাঁধ ও সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের কাজ পরিদর্শন করেছেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম এমপি। নদীতীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিদর্শনের পাশাপাশি মেঘনা থেকে বালু উত্তোলন নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা জোরালো হয়েছে।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬) বিকেলে ভৈরব উপজেলার সাদেকপুর ইউনিয়নের মেন্দিপুর এলাকায় গিয়ে শহর রক্ষা বেড়িবাঁধ ও সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন প্রতিমন্ত্রী। এ সময় প্রকল্পের অগ্রগতি, নদীর তীরের বর্তমান অবস্থা এবং ভাঙন প্রতিরোধে নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে তথ্য নেন।
পরে মেঘনার তীরবর্তী কালীপুর গ্রামের ভাঙনপ্রবণ এলাকাও পরিদর্শন করেন তিনি বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রকল্পটি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে ভৈরব শহর ও আশপাশের জনবসতি নদীভাঙনের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থারও উন্নতি হবে।
বালু উত্তোলন নিয়ে এমপির বক্তব্য
নদীভাঙন প্রতিরোধের উদ্যোগের মধ্যেই মেঘনা নদী থেকে বালু উত্তোলন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ জাগরণী শান্তিসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা ও ভৈরব-কুলিয়ারচর আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম।
শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন এবং নদীর তীর সংরক্ষণে পাথর ফেলার কার্যক্রম একই সঙ্গে চলা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তাঁর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নদী ব্যবস্থাপনা, বালু উত্তোলন এবং তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের মধ্যে সমন্বয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ইজারা নিয়েই বালু উত্তোলনের দাবি
তবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষের দাবি, ভৈরবের মেঘনা নদীর নির্ধারিত এলাকায় সরকারি বিধি অনুসরণ করেই ইজারা নিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
ভৈরব উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আল মামুন দাবি করেন, নিয়ম মেনেই নির্ধারিত স্থান থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। তিনি বৈধ কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে এর প্রতিবাদ জানান।
তবে ইজারার আওতাভুক্ত সীমানা, উত্তোলনের অনুমোদিত পরিমাণ এবং চুক্তির অন্যান্য শর্ত যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না—এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
আগানগরে স্থানীয়দের বিক্ষোভ
এর আগে বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) আগানগর ইউনিয়নের লুন্দিয়া ও খলাপাড়া এলাকায় নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে স্থানীয় বাসিন্দারা তদন্ত কমিটির সামনে বিক্ষোভ করেন।
বিক্ষোভকারীরা নদী রক্ষার দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন। তাদের অভিযোগ, নির্ধারিত এলাকার বাইরে ড্রেজার ব্যবহার করে বালু উত্তোলন করা হলে নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভাঙনের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তবে বালু উত্তোলনের কারণে নির্দিষ্টভাবে কোনো এলাকায় ভাঙন বেড়েছে কি না, কিংবা উত্তোলনকারীরা ইজারার শর্ত লঙ্ঘন করছেন কি না—এ বিষয়ে তদন্তের ফলাফলই চূড়ান্তভাবে বিষয়টি স্পষ্ট করবে।
তদন্তে যেসব বিষয় যাচাইয়ের দাবি
নদীভাঙন প্রতিরোধ ও বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে গত ৬ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন গণঅধিকার পরিষদের কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ভৈরবের সংগঠক ইমতিয়াজ আহমেদ কাজল।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার সরেজমিনে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এ সময় বালুমহালের অনুমোদিত সীমানা, ইজারা সংক্রান্ত কাগজপত্র, উত্তোলনের পরিমাণ এবং হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের সঙ্গে কার্যক্রমের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—এসব বিষয় পরীক্ষা করার দাবি জানানো হয়।
আইন কী বলছে
বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ এবং পরবর্তী সংশোধনী অনুযায়ী নদী থেকে বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত বালুমহাল, পরিবেশ ও প্রতিবেশের ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য, জনস্বার্থ এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনা করার বিধান রয়েছে।
কোনো এলাকায় বালু উত্তোলনের ফলে পরিবেশ বা প্রতিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও জনস্বার্থে ঝুঁকি সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও রয়েছে।
ফলে কোনো স্থানে ইজারা থাকলেই বালু উত্তোলনের সব কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ হয়ে যায় না; ইজারার নির্ধারিত সীমানা, পরিমাণ ও অন্যান্য শর্ত অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
নদী রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের দাবি
মেঘনা নদীর ভাঙন ঠেকাতে একদিকে বেড়িবাঁধ, সড়ক ও তীর সংরক্ষণ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে একই নদীতে বালু উত্তোলনের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ফলে নদী ব্যবস্থাপনায় সরকারি প্রকল্প ও বালু উত্তোলনের কার্যক্রমের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় আছে কি না—এখন সেটিই আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, চলমান তদন্তে শুধু বালু উত্তোলনের বৈধতা নয়, নদীর ভাঙনের প্রকৃত কারণ, উত্তোলনের স্থান ও পরিমাণ, নদীর তলদেশের পরিবর্তন এবং তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাবও যাচাই করা হোক।
তদন্তের ফলাফল ও সরকারি কারিগরি তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে মেঘনা নদী ও তীরবর্তী মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের বালু উত্তোলন-ভাঙন বিতর্কেরও একটি স্পষ্ট সমাধান পাওয়া যেতে পারে।
Post Views: 28