ফুটবল বিশ্বে নিজের অসাধারণ গোল করার ক্ষমতা, নিখুঁত ফিনিশিং এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের জন্য পরিচিত হ্যারি কেইন। ইংল্যান্ডের এই তারকা স্ট্রাইকার ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে নিয়মিত গোল করে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে চলেছেন। তবে নিজের ফুটবলীয় দক্ষতার কথা বলতে গিয়ে এবার এমন এক স্বীকারোক্তি দিয়েছেন, যা ফুটবলপ্রেমীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে। নিজের খেলায় একটি গুণের অভাব অনুভব করেন বলে জানিয়েছেন কেইন। আর সেই গুণটি হলো আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসির বাঁ পায়ের অসাধারণ দক্ষতা। কেইনের মতে, মেসির মতো বাঁ পা যদি তাঁর থাকত, তাহলে তাঁকে থামানো প্রতিপক্ষের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে যেত। নিজের এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় মেসির প্রতি নিজের মুগ্ধতাও প্রকাশ করেছেন ইংলিশ অধিনায়ক।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে হ্যারি কেইনকে প্রশ্ন করা হয়, নিজের ফুটবলীয় দক্ষতার বাইরে অন্য কোনো খেলোয়াড়ের কাছ থেকে একটি গুণ নেওয়ার সুযোগ পেলে তিনি কার কোন গুণটি বেছে নিতেন। উত্তরে কেইন সরাসরি লিওনেল মেসির বাঁ পায়ের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘যদি আমি মেসির বাঁ পা পেতাম, তাহলে আমার মনে হয় আমাকে থামানো খুবই কঠিন হতো।’ কেইনের এই বক্তব্য ইতোমধ্যে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, নিজের সময়ের অন্যতম সেরা গোলস্কোরার হয়েও তিনি অন্য একজন ফুটবলারের বিশেষ দক্ষতাকে নিজের কাঙ্ক্ষিত গুণ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। বিশেষ করে মেসির বাঁ পায়ের প্রতি তাঁর এই প্রশংসা ফুটবল বিশ্বে আর্জেন্টাইন তারকার অসাধারণ প্রতিভার আরেকটি স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
লিওনেল মেসির বাঁ পায়ের দক্ষতা ফুটবল ইতিহাসে বিশেষভাবে পরিচিত। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি অসংখ্য গোল করেছেন, সতীর্থদের জন্য তৈরি করেছেন গোলের সুযোগ এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও নিজের নিয়ন্ত্রণ ও নিখুঁত শটের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে পরাস্ত করেছেন। মেসির বাঁ পায়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি শুধু দূরপাল্লার শট কিংবা কাছ থেকে ফিনিশিংয়েই দক্ষ নন; বরং ড্রিবলিং, পাসিং, ফ্রি-কিক এবং বল নিয়ন্ত্রণেও অসাধারণ। প্রতিপক্ষের একাধিক খেলোয়াড় সামনে থাকলেও অল্প জায়গার মধ্যে বল নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। তাঁর বাঁ পায়ের শট অনেক সময় গোলরক্ষকদের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। এসব কারণেই মেসির বাঁ পা ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের বিষয় হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে হ্যারি কেইনও আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সম্পূর্ণ স্ট্রাইকার হিসেবে বিবেচিত। গোল করার পাশাপাশি আক্রমণ গড়ে তোলা, সতীর্থদের সঙ্গে সমন্বয় এবং মাঝমাঠ থেকে খেলা পরিচালনায়ও তাঁর দক্ষতা রয়েছে। ইংল্যান্ড জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে দলের আক্রমণভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। ক্লাব ফুটবলেও নিজের ধারাবাহিক গোল করার সামর্থ্যের কারণে তিনি বিশেষ পরিচিতি পেয়েছেন। কেইনের ডান পায়ের ফিনিশিং অত্যন্ত কার্যকর হলেও বাঁ পা এবং হেডেও গোল করার সক্ষমতা রয়েছে তাঁর। তবে নিজের খেলায় মেসির বাঁ পায়ের মতো অসাধারণ দক্ষতা থাকলে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠতেন বলে মনে করেন তিনি। তাঁর এই বক্তব্যে আত্মবিশ্বাসের পাশাপাশি নিজের খেলার উন্নতির আকাঙ্ক্ষাও ফুটে উঠেছে।
ফুটবলে একজন খেলোয়াড়ের জন্য দুই পায়ে সমান দক্ষতা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী অনেক সময় পছন্দের পা ব্যবহার করার সুযোগ পাওয়া যায় না। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা সাধারণত আক্রমণকারীর শক্তিশালী পায়ের দিক বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে দুই পায়ে কার্যকরভাবে শট নেওয়ার ক্ষমতা একজন স্ট্রাইকারকে বাড়তি সুবিধা দেয়। মেসির ক্ষেত্রে বাঁ পায়ের অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ তাঁকে একাধিকভাবে আক্রমণ করার সুযোগ দিয়েছে। কখনো ডান দিক থেকে ভেতরে ঢুকে বাঁ পায়ে শট নিয়েছেন, আবার কখনো সরাসরি ফ্রি-কিক থেকে গোল করেছেন। তাঁর এই বিশেষত্ব দীর্ঘদিন ধরে ফুটবল বিশ্লেষকদের আলোচনার বিষয়। কেইনও সম্ভবত সেই কারণেই মেসির বাঁ পাকে নিজের কাঙ্ক্ষিত ফুটবলীয় অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
মেসি ও কেইনের ফুটবলীয় বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অবশ্য বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। মেসি মূলত আক্রমণভাগের বিভিন্ন জায়গায় খেলতে পারেন এবং নিজের ড্রিবলিং, পাসিং ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে পুরো ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে সক্ষম। অন্যদিকে কেইন একজন কেন্দ্রীয় স্ট্রাইকার হিসেবে গোল করার পাশাপাশি আক্রমণভাগে বল ধরে রাখা এবং সতীর্থদের খেলায় যুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দুজনের খেলার ধরন আলাদা হলেও গোল করার সামর্থ্য এবং মাঠে প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা তাঁদের বিশ্ব ফুটবলের আলোচিত তারকাদের মধ্যে জায়গা করে দিয়েছে। তাই কেইনের মুখে মেসির বাঁ পায়ের প্রশংসা ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছে।
বিশেষ করে মেসির দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বাঁ পায়ের অসাধারণ ব্যবহার তাঁকে ফুটবল ইতিহাসে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। ক্লাব পর্যায়ে বার্সেলোনার হয়ে একের পর এক সাফল্য অর্জনের পাশাপাশি আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়েও বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করেছেন তিনি। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জেতানোর পথে তাঁর নেতৃত্ব, গোল এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে অবদান ফুটবল ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। মেসির খেলার প্রতিটি দিক নিয়ে সমর্থক ও বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা থাকলেও তাঁর বাঁ পায়ের দক্ষতা বরাবরই বিশেষ প্রশংসা পেয়েছে। বিভিন্ন প্রজন্মের ফুটবলাররাও তাঁর এই দক্ষতার প্রশংসা করেছেন। কেইনের মন্তব্য সেই ধারাবাহিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সব মিলিয়ে হ্যারি কেইনের এই মন্তব্য শুধু মেসির বাঁ পায়ের প্রশংসা নয়, বরং একজন বিশ্বমানের ফুটবলারের আরেকজন কিংবদন্তির বিশেষ প্রতিভার প্রতি স্বীকৃতি। নিজের গোল করার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও মেসির বাঁ পা পাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন কেইন। তাঁর ভাষায়, সেই দক্ষতা থাকলে তাঁকে থামানো অত্যন্ত কঠিন হতো। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এই মন্তব্যের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, মেসির বাঁ পায়ের জাদু শুধু সাধারণ সমর্থকদেরই মুগ্ধ করে না, বরং বিশ্বের শীর্ষ পর্যায়ের তারকারাও সেই দক্ষতার প্রতি মুগ্ধ। আর সেই কারণেই হ্যারি কেইনের এই ছোট্ট স্বীকারোক্তি ফুটবল আলোচনায় বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।

